-২-
সুদর্শন সমীপে
সন্দীপের দেশের বাড়ি দেবীপুরের পশ্চিমে উদয়পুর গ্রামে।সন্দীপের দাদু ছিলেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব।তার প্রভাবেই সন্দীপের বাবা দেবীপুরের কলেজে ক্লার্ক এর চাকরি পান।অথচ অশেষবাবু পড়াশুনায় যথেষ্ট ভালো ছিলেন, উচ্চ সম্ভবনা ছিল কিন্তু পিতৃআজ্ঞায় কেরানীর চাকরি নিয়ে দেবীপুরেই থেকে গেলেন।সন্দীপ মাধ্যমিক পর্যন্ত উদয়পুরে পড়েছে তারপর HS দেবীপুরে। ও যখন ক্লাস নাইন এ পড়ে তখনই অশেষবাবু দেবীপুরে বাড়ি বানান।সন্দীপের মাধ্যমিক পরীক্ষার পরেই ওরা দেবীপুরে শিফট করে। সুদর্শন ভট্টাচার্য্য এর বাড়ি কলেজের কাছে একটি নতুন গড়ে ওঠা পাড়ায়।এখানে কলেজের বেশিরভাগ অধ্যাপক বাড়ি করে থাকায় পাড়ার নাম হয়ে উঠেছে “প্রফেসর পল্লী”।এখানে মূলত সরকারি কর্মচারী , ধনী ব্যবসায়ী , শিক্ষকদের বাস।উচ্চ মধ্যবিত্ত পাড়া হিসাবেই পরিচিত এটি।
সন্ধ্যে ছটা নাগাদ সন্দীপ এসবির বাড়িতে পৌঁছলো।মাঝে মাঝে বাড়ি এলে সাইকেলটা চালানো হয়।সল্টলেকে এ সুযোগ পায় না ।এসবির বাড়ির বাইরে সাইকেলটি রেখে সন্দীপ বেল টিপলো।জানালা দিয়ে রবিঠাকুরের গান ভেসে আসছে।”কে দিল আবার আঘাত”।এসবি নিজেই দরজা খুললেন।হেসে বললেন “তোমার জন্যই গানটা চালিয়ে রেখেছি!”
রান্নাঘর থেকে অধ্যাপকজায়া আমিতাদেবী বেরিয়ে এলেন।
“কেমন আছো সন্দীপ?”
“ভাল আছি।আপনি কেমন আছেন?”
“ভালো বাবা।তোমার জন্য চা করে রেখেছি ।দাঁড়াও দিচ্ছি।”
এসবি আর সন্দীপ ড্রইংরুমে বসলো।ড্রইংরুম না বলে লাইব্রেরি বলাই ঠিক হবে।দেওয়াল আলমারিতে অসংখ্য বই- দেশী, বিদেশী,বিজ্ঞান,সাহিত্য কি নেই সেখানে!
এখন ও তিনি বই পড়ছিলেন।ইজি চেয়ারের পাশে ছোট টেবিলে শরদিন্দু অমনিবাস পড়ে আছে।
“ব্যোমকেশ পড়ছিলেন?”
এসবি হাসলেন।
“ আমার মতে “মগ্ন মৈনাক” এর মতো রহস্য উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে আর লেখা হয়নি।”
“ঠিক বলেছেন”
“জানো সন্দীপ আমার সেই সব রহস্য উপন্যাস বেশী ভাল লাগে যেখানে অতীত অপরাধের ছায়া বর্তমান জীবনে পরে।আর জানো তো অপরাধ কখনো চাপা থাকে না।যে অপরাধ অতীতের গর্ভে লুকিয়ে আছে তা অনেক সময় পরিস্থিতির চাপে পড়ে, সত্যসন্ধানীর অনুসন্ধিৎসায় আলোকিত হয়, উন্মোচিত হয়।”
“স্যার , আগাথা ক্রিস্টির “দ্য নেমেসিস” এ যেমন হয়েছিল।পুরানো অপরাধের শাস্তি পেয়েছিল অপরাধী।অপরাধীর নিয়তি হয়ে দেখা দিয়েছিলেন মিস মারপল”
“নেমেসিস….নিয়তি!গম্ভীরভাবে বললেন এসবি।খুব প্রিয় শব্দ আমার।মগ্ন মৈনাকের অপরাধী তো ধরা পরে গেছিলো।কিন্তু আরও কত মগ্ন মৈনাক পাড়ায় পাড়ায় শহরে গ্রামে লুকিয়ে আছে তার ইয়াত্তা নেই।কত মানুষ অপরাধ করে পার পেয়ে যায় জানো?সমাজের দরকার একটা ব্যোমকেশ।যে অপরাধীর নিয়তি হয়ে দেখা দেবে,সমাজকে শুদ্ধ করবে।”
“এই বয়েসে তুমি কি ব্যোমকেশগিরি করবে নাকি?”
আমিতাদেবী চা আর বেগুনি নিয়ে ঢুকলেন।
“আরে না না ! এমনি কথা হচ্ছিল সন্দীপের সঙ্গে।”
চা রেখে আমিতাদেবী চলে গেলেন।
“শোনো সন্দীপ আগামী রবিবার আমি ছজন লোককে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।তারা প্রত্যেকে এক একজন খুনি।তারা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে কাউকে খুন করেছে।কিন্তু পার পেয়ে গেছে।কেউ ঘুনাক্ষনেও জানতে পারেনি যে সে ওই খুনের ব্যাপারে জড়িত।আমি তাদের কাছে আবেদন রাখবো তারা যেন তাদের অতীত অপরাধের কথা স্বীকার করে আর প্রায়চিত্ত স্বরূপ সমাজের জন্য কল্যাণমূলক কিছু কাজ করে।নইলে তাদের নাম আমি জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেব।”
চমকে উঠল সন্দীপ।
“কিন্তু কি বলে তাদেরকে ডাকবেন?আসল উদ্দেশ্য তো প্রথমেই বলা যায় না।তাহলে ওরা তো আসতেই চাইবে না।”
“এমনি সাহিত্য আলোচনা আসর এর নাম করে ডাকবো।তারপর ধীরে ধীরে আসল কথাটা বলবো।”
সন্দীপের মন কোনো এক অজানা আশঙ্কায় ভরে গেল।
“স্যার অতীত অপরাধের কথা উত্থাপন করলে যদি ওরা violent হয়ে যায়।তাদের criminal instinct তো আবার জেগে উঠতে পারে।তারা আবার কোনো অপরাধ করে বসতে পারে।কোনঠাসা বেড়াল প্রাণের ভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।”
“তখনই খেলাটি জমবে সন্দীপ।অপরাধী আর সত্যসন্ধানীর চোরপুলিস খেলায় এটাই তো মজা।প্রকৃত অপরাধী যখন জানবে যে সে সন্দেহের আওতায় পড়েছে তখনই সে নারভাস হয়ে পড়বে।প্রতিক্রিয়া দিতে সে বাধ্য।পুকুরে একটি ঢিল ফেলার অপেক্ষা।তরঙ্গ তৈরী হতে বাধ্য।”
সন্দীপ বুঝলো “রহস্য ক্রমেই ঘনিয়ে উঠছে।”
“স্যার আপনি কাদেরকে ডাকতে চলেছেন জানতে ভীষণ ইচ্ছে করছে”
“হ্যা।আমি তোমাকে একে একে তাদের কথা বলবো।”

No comments:
Post a Comment